নৌকা তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছে কারিগররা

0
9

বছর ঘুরে চলে এসেছে বর্ষা, বইছে সুবাতাস। তাই বর্ষার আগমনে নৌকার কারিগররা এখন ব্যস্ত সময় পার করছে। বছরের অন্য মাসগুলো যেমনই কাটুক, বর্ষার অপেক্ষায় তারা অধীর আগ্রহে বসে থাকে। কারণ বর্ষায় ব্যাপারীরা তাদের মৌসুমি ব্যবসার জন্য নৌকা তৈরির জন্য বিভিন্ন প্রকার কাঠ যেমন- মাথাকাঠ, বাইমা গুড়া, চাড়া, দারত, থুতি, বাহা, পাঠাতন, মাছাইল এবং তলি (নীচের অংশ) কাঠ ক্রয় করে মওজুত করতে থাকে। আর তখনই বেড়ে যায় কারিগরদের কদর আর এ সময় তারাও ব্যস্ত হয়ে নৌকা তৈরির যন্ত্রপাতি হাতুরী, বাডাল, করাত, র্বমা (কাঠ ছিদ্র করার যন্ত্র) মাডাম, টেইপ, ডাইবার, বেনা, রামদা, খল, বাইস, বরদু, কাওলাল, ইত্যাদি বিভিন্ন প্রকার যন্ত্রপাতি নিয়ে তৈরি থাকে। কখন কোন ব্যাপারীর ডাক পরে। কেউ কেউ আবার অগ্রিম দাদনও নিয়ে রেখেছে। সব মিলিয়ে ব্যাপারী আর কারিগর উভয়ে ব্যস্ত সময় পার করছে।

nift

এমনই ভাবে গড়ে উঠেছে ঐতিহ্যবাহী ভৈরব ও কুলিয়ারচরের বিভিন্ন নৌকার হাট। এক সময় বিশাল নৌকার হাট বসতো ভৈরবের আকবর নগর ও শিমুলকান্দি বাজার ও কুলিয়ারচরের ছয়সতি বাসস্ট্যান্ড বাজারে, যা প্রতি সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে। এছাড়া এখন নতুন করে ছোট ছোট ভাবে গড়ে উঠছে কুসাই নৌকা বানানো। যা ভৈরবের আগানগর ইউনিয়নের ছাগাইয়া, ছায়তনতলা। শিমুলকান্দির ইউনিয়নের শিমুলকান্দি বাজার, কালিকা প্রসাদ ইউনিয়নের আকবর নগর বাজারে। আর কুলিয়ারচরের ছয়ছতি বাজারে। এইসব বাজার থেকে আশে পাশের বিভিন্ন এলাকা হতে আসে কুসাই নৌকা নিতে।

কুলিয়ারচরের ছয়ছতির গ্রামের নৌকার ব্যাপারী ইছব মিয়ার পুত্র মোঃ মানিক মিয়া বলেন এখন আর আগের মত এত জমজমাট হয় না। আগে ১০ হাত একটা নৌকা বিক্রি করতাম ১৫০০ টাকা থেকে ২০০০ টাকা আর ১২ হাত একটা নৌকা বিক্রি করতাম ২০০০ থেকে ২৫০০টাকায় তার পরও আমাদের লাভ হত। আর এখন সেই একই মাপের নৌকা বিক্রি করতে হয় সাড়ে ৮ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকায় তার পরও লাভ করা কঠিন হয়ে যায়। কারণ হিসাবে জানতে চাইলে তিনি বলেন আগে কাঠ দাম ছিল কম এবং কারিগরের মজুরী ছিল মাত্র ২০০ শত টাকা আর এখন মালের দাম এবং মজুরী বেড়েছে। তা ছাড়া ক্রেতা কমার কারণে বিচা-বিক্রি কম। উত্তর দক্ষিণ পূর্ব পশ্চিম সব দিক থেকেই আমাদের হাটে ব্যাপারী ক্রেতা আসতো কিন্তু এখন বিভিন্ন এলাকায় রাস্তা এবং হাউজিং কোম্পানি বালু ভরাট করার ফলে অনেক জায়গাই এখন আর নৌকার প্রয়োজন হয় না। তাই ক্রেতা ও অনেক কমে গেছে। এখন শুধু যে জায়গাতে বালু ভরাট হয় নাই বা ব্রিজ কালভার্ট নাই সেখান থেকে কিছু ক্রেতা নৌকার বাজারে আসে ।

সে কারণেই নৌকার ব্যাপারী এবং কারিগরও এ পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে গেছে। আর আমরা আমাদের বাপ দাদার ব্যবসা হিসাবে ধরে রেখেছি মাত্র।

শিমুলকান্দি এলাকার আনোয়ার মিস্ত্রি বলেন আমি প্রায় অনেক বছর ধরে এই পেশায় নিয়োজিত আছি। তবে এখন আর আগের মত চলে না শুধু বর্ষায় এই কাজ করি আর বাকি সময় অন্য কাজ করি।

ছাগাইয়া এলাকার বিজয় মিস্ত্রীর পুত্র দিলিপ মিস্ত্রী বলেন, আগে বর্ষা আসলে বিভিন্ন গ্রামের একমাত্র চলার যান ছিল নৌকা। তখন আমাদের নৌকার চাহিদাও ছিল প্রচুর ।এখন এ সব এলাকায় ইঞ্জিন চালিত ট্রলার চলাচল করায় অনেকাংশেই নৌকার চাহিদা কমে গেছে। এছাড়া রাস্তাঘাটও ভাল তাই নৌকার কাজও লাগে কম।তবুও ভরা বর্ষায় যখন পানিতে এলাকা টুই টুম্বুর থাকে তখন কিছু লাভের আশায় আবার ফিরে আসি সেই পুরনো ব্যবসায়।

আকবর নগর এলাকার হাজী আব্দুল হাই, দেলোয়ার, গিয়াসদ্দীন বলেন। আগে নৌকার হাটের যে কদর ছিল সে তুলনায় এখন নেই বললেই চলে। তবে বর্ষার ভরা মৌসুমে কিছু পাইকারি ব্যবসায়ীরা এবং খুচরা ক্রেতা আসার কারণেই এই শিল্প এখনও কিছুটা হলেও টিকে আছে। তবে বর্ষা যদি বন্যায় রূপ নেয় তখন নৌকার কদর বেড়ে যায় এবং দাম অনেক গুন বেড়ে যায়। নৌকার মধ্যে রয়েছে ডিঙ্গি নৌকা ,গয়না নৌকা এবং কোষা নৌকা। তবে মাঝে মধ্যে বাইসের নৌকাও বাজারে দেখা যায়।

  • 9
    Shares