টেরাকোটা শিল্পের অনন্যা নিদর্শন আষ্টাদশ শতাব্দীর কান্তজিউ মন্দির

0
1

 

বিকাশ ঘোষ,বীরগঞ্জ(দিনাজপুর) প্রতিনিধি :

টেরাকোটা অলঙ্করণের বৈচিত্র্য ইন্দো-পারস্য-ভাস্কর কৌশল ও শিল্প মহিমায় বিস্ময় জাগানিয়া কান্তজিউ মন্দিরকে ঘিরে পর্যটন এলাকা গড়ে তুলতে প্রায় ৭৫ কোটি টাকা ব্যয়ে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ কাজ শেষ। দিনাজপুর জেলা শহর থেকে মন্দিরে যাবার জন্য ঢেপা নদীর উপর তৈরি হয়েছে ব্রীজ। ওই ব্রীজটি না থাকায় প্রায় ১০ কিলোমিটার রাস্তা ঘুরে মন্দিরে যেতে হতো। পর্যটকরা এসে সেখানে থাকার কোন পরিবেশ ছিল না। সে কারনে মন্দিরের পাশেই নির্মাণ করা হয়েছে পর্যটন মোটেলের রেষ্ট হাউজ। দর্শনার্থীদের ইতিহাস-ঐতিহ্য জানাতে নির্মাণ করা হয়েছে মিউজিয়াম। কেনা-কাটার সুবিধার্থে পাশেই মার্কেট তৈরি করে এর আশপাশের রাস্তা উন্নয়ন করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, পার্শ্ববর্তী শিব মন্দির ও রাজবেদী সংস্কার করে আমুল পরিবর্তন আনা হয়েছে। ওই এলাকার সংসদ সদস্য মনোরঞ্জন শীল গোপালের নিবিড় তত্ত্বাবধানে এ সব সংস্কার ও উন্নয়ন সম্ভব হয়েছে। এতে ওই এলাকার মানুষ এমপি গোপালের প্রতি অকৃত্রিম কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।
দিনাজপুর জেলা সদর হতে ২০ কিঃ মিঃ উত্তরে এবং কাহারোল উপজেলা সদর হতে ৭ কিঃ মিঃ দক্ষিণ পূর্বে সুন্দরপুর ইউনিয়নে দিনাজপুর-তেঁতুলিয়া মহাসড়কের পশ্চিমে ঢেপা নদীর তীরে প্রাচীণ টেরাকোটার অনন্য নিদর্শন কান্তজিউ মন্দির অবস্থিত। কালিয়াকান্ত জিউ অর্থাৎ শ্রী-কৃষ্ণের বিগ্রহ অধিষ্ঠানের জন্য এই মন্দির নির্মিত। এই জন্য এর নাম কান্তজিউ মন্দির। মন্দিরটি যে স্থানে স্থাপিত তার নাম কান্তনগর। কান্তনগর সম্পর্কে পৌরাণিক বহু গল্প ও উপাখ্যান প্রচলিত রয়েছে। কথিত রয়েছে, মহাভারতে বর্ণিত বিরাট রাজার গো-শালা ছিল এখানে। প্রকৃতপক্ষে মন্দিরটি যেখানে তৈরী হয়েছে সেটি একটি প্রাচীন স্থান এবং প্রাচীন দেওয়ালঘেরা দুর্গ নগরীরই একটি অংশ। প্রায় ১ মিটার (৩ ফুট) উঁচু এবং প্রায় ১৮ মিটার (৬০ ফুট) বাহুবিশিষ্ট প্রস্তরনির্মিত একটি বর্গাকার বেদীর উপর এই মন্দির নির্মিত। শোনা যায়, বেদীর পাথরগুলো আনা হয়েছিল প্রাচীন বানগড় (কোটিবর্ষ দেবকোট) নগরের ভেঙ্গে যাওয়া প্রাচীন মন্দিরগুলো হতে। পাথরের ভিত্তি বেদীর উপর মন্দিরটি ইটের তৈরী। বর্গাকারে নির্মিত মন্দিরের প্রত্যেক বাহুর দৈর্ঘ্য প্রায় ১৬ মিটার (৫২ ফুট)। মন্দিরের চারিদিকে রয়েছে বারান্দা। প্রত্যেক বারান্দার সামনে রয়েছে ২টি করে স্তম্ভ। স্তম্ভগুলো বিরাট আকারের এবং ইটের তৈরী। স্তম্ভ ও পাশের দেওয়ালের সাহায্যে প্রত্যেকটি দিকে ৩টি করে বিরাট খোলা দরজা তৈরী করা হয়েছে। বারান্দার পরেই রয়েছে মন্দিরের কামরাগুলো। একটি প্রধান কামরার চারিদিকে রয়েছে বেশ কয়েকটি ছোট কামরা। ৩ তলা বিশিষ্ট এই মন্দিরের নয়টি চূড়া বা রতœ ছিল। এজন্য এটিকে নবরতœ মন্দির বলা হয়ে থাকে। ১৮৯৭ খৃষ্টাব্দে ভূমিকম্পে মন্দিরের চূড়াগুলো ভেঙে গেছে। মন্দিরের উচ্চতা ৭০ ফুট। মন্দিরের উত্তর দিকের ভিত্তিবেদীর শিলালিপি হতে জানা যায়, দিনাজপুরের জমিদার মহারাজা প্রাণনাথ রায় (মৃত্যু ১৭২২ খৃঃ) তার শেষজীবনে মন্দির তৈরীর কাজ শুরু করেন এবং তার মৃত্যুর পর তার আদেশ অনুসারে দত্তক পুত্র মহারাজা রামনাথ রায় এই মন্দির তৈরীর কাজ শেষ করেন ১৭৫২ খৃষ্টাব্দে। ইট দ্বারা তৈরী এই মন্দিরের গায়ে পোড়ামাটির চিত্রফলকের সাহায্যে রামায়ণ-মহাভারতের প্রায় সব কয়টি প্রধান কাহিনী তুলে ধরা হয়েছে। সে সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণের বিভিন্ন কাহিনী এবং সম্রাট আকবরের কিছু চিত্র কর্ম রয়েছে। অতি সুন্দর ও কারুকার্যময় এই কান্তজীর মন্দির। পোড়া মাটির চিত্র ফলকের এমন সুন্দর ও ব্যাপক কাজ বাংলার আর কোন মন্দিরেই নেই। সারা উপ মহাদেশেও আছে কিনা সন্দেহ। ঐতিহাসিক বুকানন হ্যামিলটনের মতে, এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দরতম মন্দির। কান্তজিউ বা শ্রীকৃষ্ণের বিগ্রহ ৯ মাস এই মন্দিরে অবস্থান করে এবং রাস পূর্ণিমায় ১৫ দিনব্যাপী তীর্থ মেলা বসে। দেশ-বিদেশ হতে বহু পূণ্যার্থী আসেন এই মেলায় ও মন্দিরটি দেখতে। কান্তজিউ মন্দিরে প্রতিদিন চলে পুজা অর্চনা। মন্দিরের সাথে রয়েছে তমাল বৃক্ষ। এই বৃক্ষে সুতা বেধে বিশেষ করে নারীরা বিভিন্ন প্রকার মানত করে থাকে। প্রচলিত রয়েছে মানত করলে তা পুরণ হয়।এই মন্দিরের পাশের পাড়াটিতে অর্থাৎ মাত্র সোয়া কিলোমিটার দুরে টেরাকোটার তৈরি আরেক নিদর্শন নয়াবাদ মসজিদ রয়েছে। পর্যটকরা সেখানে গেলে টেরাকোটায় নির্মিত মসজিদটি না দেখে ফেরে না। তাই সংসদ সদস্য মনোরঞ্জন শীল গোপাল ওই মসজিদটিরও সংস্কার করেছেন। মসজিদটি স্থাপনের পর এটিই প্রথম সংস্কার। এলাকার ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা এজন্য মনোরঞ্জন শীল গোপাল এমপিকে অভিনন্দন জানিয়েছেন।

  • 81
    Shares