এবারও ঘরোয়াভাবেই পালন হলো মণি-মুক্তার জন্মদিন

0
24

বিকাশ ঘোষ,বীরগঞ্জ(দিনাজপুর) প্রতিনিধিঃ

দিনাজপুরের বীরগঞ্জের যমজ দুই বোন মনি-মুক্তার শনিবার জন্মদিন। এই যমজ দুই বোন শনিবার (২২ আগস্ট) ১২বছরে পা দিতে যাচ্ছে।

প্রতিবছরের মতো এবারও ঘরোয়াভাবেই পালন হলো জোড়া লাগানো যমজ দুই বোন মনি-মুক্তার জন্মদিন। ১০ বছর আগে চিকিৎসা বিজ্ঞানের আশীর্বাদে জোড়া লাগানো যমজ দুই বোন আলাদা করা হয়। শনিবার, ২২ আগস্ট ১১ বছরে পা দিবে তারা। ১০ বছর আগে আলোচিত দুইবোন মনিমুক্তা আধুনিক বিজ্ঞানের উন্নয়নের ছোঁয়া এবং বাংলাদেশের চিকিৎসক এ আর খানের সাফল্য বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রাকে সম্ভাবনাময় করেছে। আর সাফল্যকে কাজে লগিয়ে বাংলাদেশে প্রথম অস্ত্র পাচারে মাধ্যমে জোড়া লাগানো শিশুর সফল পৃথকীকরণ করা হয়। এই সাফল্যের ইতিহাস বীরগঞ্জের জোড়া লাগানো যমজ দুই বোন মনি-মুক্তা।
বাবা মায়ের কোলে নানা চড়াই উত্তাল পেরিয়ে দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামে বেড়ে উঠা মনি মুক্তা এখন ১১বছরে পা দিতে যাচ্ছে। তারা এখন স্থানীয় পালপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৫র্থ শ্রেণির ছাত্রী।

শনিবার নিজ বাড়িতে পালন করা হবে মনি-মুক্তার জন্ম দিন। প্রতি বছর বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও মনি-মুক্তার বন্ধু-বান্ধবসহ প্রতিবেশী এবং গণমাধ্যম কর্মীদের উপস্থিতিতে কেক কেটে জন্মবার্ষিকী পালন করা হলেও এবার করোনা পরিস্থিতির কারণে ঘরোয়া পরিবেশে জন্মদিন পালন করা হবে বলে জানান মনি-মুক্তার বাবা জয় প্রকাশ পাল।
তিনি জানান, মনি মুক্তা সুস্থ এবং ভালো আছে। তারা একে অপরের সাথে খেলা করে সময় কাটায়। বেশ সুন্দর করে কথা বলে। নিয়মিত স্কুলে যায়।
জন্মদিনে দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়ে মনি-মুক্তা বলেন, আমরা চিকিৎসক হয়ে মানুষের সেবা করতে চাই। দেশবাসীর দোয়া এবং সহযোগিতা পেলে আমরা অবশ্যই আমাদের স্বপ্ন পূরণ করতে পারবো।
দিনাজপুর জেলার বীরগঞ্জ উপজেলার শতগ্রাম ইউনিয়নের পালপাড়া গ্রামের শরৎ চন্দ্র পালের পুত্র জয় প্রকাশ পাল। জয় প্রকাশ পালের স্ত্রী কৃষ্ণা রাণী পালের গর্ভে ২০০৯ সালের ২২ শে আগস্ট পার্বতীপুর ল্যাম্ব হাসপাতালে সিজারিয়ান সেকশনে অস্ত্র পাচারের মাধ্যমে মনি এবং মুক্তা জোড়া লাগা অবস্থায় জন্ম নেয়।
পরে রংপুরের চিকিৎসকগণ ঢাকা শিশু হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে যমজ বোনকে অস্ত্র পাচারের মাধ্যমে পৃথক করার পরামর্শ দেন। তাদের পরামর্শ ক্রমে ২০১০ সালের ৩০ জানুয়ারি ঢাকা শিশু হাসপাতালে মনি-মুক্তাকে ভর্তি করা হয়।
অতঃপর ২০১০ সালের ০৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকা শিশু হাসপাতালে শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. এ আর খানের সফল অপারেশনের মাধ্যমে মনি-মুক্তা ভিন্ন সত্ত্বা লাভ করে। বাংলাদেশের চিকিৎসা বিজ্ঞানে সৃষ্টি হয় এক নতুন ইতিহাস।
মনি-মুক্তার বাবা জয় প্রকাশ পাল বলেন, সে সময় গ্রামের মানুষ এটাকে অভিশপ্ত জীবনের ফসল বলে প্রচার করতে থাকত। সমাজের নানা কুসংস্কারে প্রায় এক ঘরে হয়ে পড়েছিলাম। সমাজের নানা অপবাদে গ্রামে আসিনি। হতাশার মাঝে স্বপ্ন দেখি মনি-মুক্তাকে নিয়ে। বিভিন্ন চিকিৎসকের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে থাকি তাদের স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাওয়ার জন্য। আমাদের স্বপ্ন বাস্তব হয় ডা. এ আর খানের কারণে। সেই মানুষটির কারণে আমাদের এই দুই সন্তানের নতুন করে বেঁচে থাকা।
মনি-মুক্তার মা কৃষ্ণা রাণী পাল জানান, ২০০৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নিয়ে প্রথমে ২১ ফেব্রুয়ারি পার্বতীপুরে বাবার বাড়িতে আসি। কিছুদিন সেখানে থাকার পর নিজগ্রাম বীরগঞ্জ উপজেলার পালপাড়ায় মনি-মুক্তাকে নিয়ে আসি। সৃষ্টি কর্তার আশীর্বাদে এবং ডা. এ আর খানের সাফল্যে আমরা মনি মুক্তাকে স্বাভাবিক ভাবে ফিরে পেয়েছি। আমরা সব কষ্ট ভুলে তাদেরকে চিকিৎসক হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। মনি-মুক্তা এবং পরিবারের জন্য সকলের দোয়া কামনা করেছেন তিনি।
মনি-মুক্তার একমাত্র বড় ভাই সজল কুমার পাল জেলার খানসামা কলেজে বাংলা বিভাগে অনার্স শেষ বর্ষে লেখাপড়া করছেন বলে জানিয়েছেন তার বাবা জয় প্রকাশ পাল।
পালপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ধনঞ্জয় পাল ও সহকারী শিক্ষিকা শিউলি আকতার জানান, মনি-মুক্তা এখন ৫র্থ শ্রেণিতে পড়ছে। তারা লেখাপড়ায় বেশ ভালো। সহপাঠীরা তাদের খুব ভালোবাসে। মনি শান্ত হলেও মুক্তা বেশ চটপটে বলেও তিনি জানান। লেখা-পড়ার পাশাপাশি স্থানীয় ভাবে নাচ শিখছে তারা। উপজেলা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে বেশ সুনাম কুড়িয়েছে যমজ দুই বোন।

  • 70
    Shares