আধুনিক পুলিশ গড়তে প্রয়োজন যুগোপযোগী আইন

0
12

বাংলাদেশ পুলিশের বড় ধরনের পরিবর্তনে আইনি সংস্কার খুবই জরুরি। আধুনিক প্রযুক্তি সম্পন্ন ও ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে পুলিশকেও করতে হবে যুগোপযোগী আধুনিকায়ন। কিন্তু বাস্তবে বাংলাদেশ পুলিশ এখনো পরিচালিত হচ্ছে ১৮৬১ সালের সেই পুরাতন পুলিশ আইন দিয়ে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এ পুরাতন আইন দিয়ে পুলিশ পরিচালনা করা যেমন দুরূহ তেমনই এ বাহিনীকে আরও দক্ষ ও আধুনিকায়ন করতে প্রয়োজন আইনি সংস্কার। ছুটি এবং কর্মঘন্টা নিয়ে রয়েছে পুলিশ সদস্যদের অনুযোগ। আবার বৃটিশ রচিত আইনেও আছে অনেক অসামঞ্জস্য।

২০০৭ সালে পুলিশ বিভাগকে আধুনিকায়ন করার লক্ষ্যে পুলিশ সংস্কার কর্মসূচির আওতায় মোট ১৬৩টি ধারা এবং ৫টি তফশীল নিয়ে প্রস্তুত করা হয় খসড়া পুলিশ অধ্যাদেশ। প্রস্তাবিত পুলিশ অধ্যাদেশ-২০০৭ অনুযায়ী সংস্কার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে পুলিশের ওপর মন্ত্রণালয়ের খবরদারি ও নিয়ন্ত্রণ হবে অনেক শিথিল। পুলিশকে রাজনৈতিক স্থানে ঢালাওভাবে ব্যবহারের সুযোগও হবে সীমিত। তবে এ প্রস্তাবের ২৩টি ধারায় মন্ত্রণালয় আপত্তি জানায়। এর মধ্যে রয়েছে ৭ ধারা অনুযায়ী আইজিপি নিয়োগ প্রক্রিয়া, ১০ ধারার ১ উপধারায় পুলিশের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ না থাকার বিষয়, ১১ ধারায় পুলিশ প্রশাসনের ক্ষমতা, ১২ ধারায় ইউনিট প্রধানের মেয়াদ, ১৫ ধারায় পুলিশ সুপারদের ক্ষমতা, ৩৭ ধারায় জাতীয় পুলিশ কমিশন গঠন, ৬৮ ধারায় পুলিশের পদোন্নতি, ৯৮ ধারায় পুলিশ প্রধানের ক্ষমতা ইত্যাদি।

অধ্যাদেশের ১১(১) ধারায় বলা হয়েছে- পুলিশ সার্ভিসের সার্বিক ব্যবস্থাপনা তথা প্রশাসন, অর্থ, মানবসম্পদ, বদলি, দেশের ভেতরে বা বাইরে প্রেষণে নিয়োগ, বৈদেশিক সহযোগিতা ও জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়াবলি পুলিশপ্রধানের ওপর ন্যস্ত হবে। পুলিশপ্রধান সঙ্গে পরামর্শক্রমেই সরকার পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়োগ ও বদলি করবে। পুলিশ বাহিনীর তত্ত্বাবধানে ১১ সদস্যবিশিষ্ট জাতীয় পুলিশ কমিশন নামে একটি কমিশন গঠন করার কথা বলা হয়েছে। পদাধিকারবলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কমিশনের চেয়ারম্যান হবেন। স্পিকার দ্বারা মনোনীত সংসদের চারজন এমপি, চারজন অরাজনৈতিক ব্যক্তি, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব কমিশনের সদস্য থাকবেন। পুলিশপ্রধান কমিশনের সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করবেন। নিযুক্ত পুলিশপ্রধান পদাধিকারবলে সরকারের একজন সচিবের সব ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন। পুলিশপ্রধানের সঙ্গে পরামর্শক্রমে জাতীয় পুলিশ কমিশন কর্তৃক প্রদত্ত সুপারিশ অনুযায়ী সরকার পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক ও তদূর্ধ্ব পদগুলোতে পুলিশ অফিসার নিয়োগ বা বদলি করবে। তবে কোনো কারণ ছাড়া সরকার কোনো পুলিশ অফিসারকে দুই বছরের আগে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বদলি করতে পারবে না। প্রস্তাবিত অধ্যাদেশে পুলিশপ্রধানকে সহায়তা করতে একাধিক উপদেষ্টা নিয়োগের বিধান রয়েছে। এ ছাড়া পুলিশের কোনো কাজে অযাচিত হস্তক্ষেপ ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে বলে বলা হয়েছে এ অধ্যাদেশে।

পুলিশ সদস্যদের অপরাধের বিচারের নিমিত্তে ৭১ ধারা মোতাবেক পুলিশ অভিযোগ কর্তৃপক্ষ গঠনের কথা বলা হয়েছে। ৭২ ধারা অনুযায়ী এর প্রধান হবেন একজন অবসরপ্রাপ্ত মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের আপীল বিভাগের বিচারপতি অথবা খ্যাতিসম্পন্ন একজন জাতীয় পর্যায়ের ব্যক্তি। অন্য সদস্যরা হবেন একজন অবসরপ্রাপ্ত পুলিশের মহাপরিদর্শক বা অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক, একজন অবসরপ্রাপ্ত সচিব বা অতিরিক্ত সচিব, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিত্বকারী দুইজন বিখ্যাত ব্যক্তি যার মধ্যে একজন মহিলা। এছাড়াও ৮৬ ধারা মোতাবেক পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিচারের নিমিত্তে একটি পুলিশ ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রস্তাব রয়েছে। ৯৭ ধারা অনুযায়ী পুলিশ সদস্যদের কল্যাণের জন্য একটি পুলিশ কল্যাণ ব্যুরো গঠনের কথাও উল্লেখ আছে। প্রস্তাবিত অধ্যাদেশে পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের পুলিশের চাকরির পাশাপাশি খণ্ডকালীন অন্য চাকরির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এছাড়াও খসড়ায় সংক্ষিপ্ত বিচারে ম্যাজিস্ট্রেট সংযুক্তির প্রস্তাব করা হয়েছে।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে ১৮৬১ সালের পুলিশ আইন দিয়ে আধুনিক পুলিশী সেবা আশা করা দূরূহ। বৃটিশ সরকার তাদের স্বার্থে ব্যবহার করার জন্য প্রনয়ণ করেছিল পুলিশ আইন, ১৮৬১। বৃটিশ সরকার তাদের দেশে আগেই যুগোপযোগী নতুন পুলিশ আইন প্রবর্তন করেছে। অথচ বাংলাদেশ পুলিশ এখনো পরিচালিত হচ্ছে সেই বৃটিশ রচিত আইনে। পুলিশকে আধুনিক জনমুখী সেবা প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে এখন অবশ্যিক প্রয়োজন নতুন পুলিশ আইন প্রণয়ন। যুগোপযোগী আইন প্রণয়ন হলে পাল্টে যাবে দেশের পুলিশী ব্যবস্থা, পরিবর্তন হবে সাধারণ মানুষের ধ্যান ধারনা। ১৮৬১ সালের পুলিশ আইন দিয়ে ২০২০ সালের আধুনিক সমাজে আধুনিক সেবা পাওয়া দূরূহ তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা।

প্রস্তাবিত পুলিশ অধ্যাদেশ ২০০৭ (খসড়া) ডাউনলোড লিংক
http://www.clcbd.org/document/download/101.html

  • 9
    Shares