আজ ৩০শে জুন ঐতিহাসিক সাঁওতাল বিদ্রোহ দিবস

0
2

দয়ারাম রায় , সবুজ বাংলা নিউজ ll

আজ ৩০ শে জুন ঐতিহাসিবিদ্রোহ দিবসের ১৬৮-তম সিধু, কানু দিবস। ১৮৫৫ সালে উপমহাদেশে ভগনাদিঘী গ্রামে প্রায় প্রাথমিক ভাবে ১০ হাজার সাঁওতাল আদিবাসী সহ খেটে খাওয়া মানুষ ইংরেজ শোষনের বিরুদ্ধে যে বিদ্রোহের ডাক দিয়েছিল এটাই সাঁওতাল বিদ্রোহ দিবস নামে পরিচিত। দামিন ই-কোহ নামে ভোগলপুর, বীরভূম মুর্শিদাবাদ রাজমোহলের পাহাড়তলী এলাকায় ১৩৬৩ বর্গমাইল বিস্তৃত এক বনাঞ্চলের গাছ- পালা কেটে আদিবাসীরা আবাদযোগ্য জমি গড়ে তোলে এবং সেখানে ফসল ফলাতে শুরু করে। এসব অবস্থা দেখে বিট্রিশ সরকার তাদের কাছ থেকে খাঁজনা নিতে শুরু করে। পরবর্তীতে এর মাত্রা আরো অনেক গুনে বেড়ে যায়। এর পরও সাঁওতালদের উপর বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কায়দায় নির্যাতন চলে। তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে দামিন-ই-কোহতে যখন ফসলের মাঠ ভরে যায়, তখন জমিদারদের চোখ পড়ে সে দিকে। এ অঞ্চলের ফসলের ভাল অবস্থা দেখে বীরভূম বর্ধমান থেকে কিছু বাঙ্গালী এ অঞ্চলে এসে বসতি স্থাপন শুরু করে। এর পর সাঁওতাল আদিবাসীদের সাথে তারা মহাজনী কারবার শুরু করে দেয়। কিছু দিনের মধ্যেই অনেক আদিবাসী পরিবার ঋণের জালে আটকা পড়ে। আবার কিছু দিনের মধ্যেই অঞ্চলে থানা, আদালত ও আমলারা আসে। এর পর শুরু হলো জমিদার, মহাজন, পুলিশ ও আমলাদের জুলুম নির্যাতন। ফলে সে অঞ্চলে আদিবাসীদের টিকে থাকা প্রায় অনিশ্চিত হয়ে পড়ল। ১৮৪৮ সালে দিকে মহাজনদের জ্বালায় দামিন-ই-কোহ এলাকায় ৩ টি গ্রামের সাঁওতাল পরিবার দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। অন্যায় অত্যাচার সাঁওতালদের ধর্য্যরে মধ্যে থাকলেও মহাজনদের অত্যাচার সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যায়। সাঁওতাল আদিবাসীরা মাঠে ফসল ফলায়, আর ফসলের অধিকাংশ যায় মহাজন ও জমিদারদের গোলায়। তাদের এ অবস্থা দেখে ভগনাডির নারায়ন মাঝির চার ছেলে সিধু, কানু, চাঁদ ও ভৈরব বসে থাকতে পারলেন না। তাদের অন্তরে প্রতিবাদের ঝড় বইতে শুরু করল। সাঁওতালদের সংকটের সময় জমিদার মহাজনেরা সুযোগ বুঝে কিছু অর্থ, শস্য অধিক সুদে আদিবাসীদের ঋণ দিত। উচ্চ হারে সুদ নিয়েও তারা ওজনে ঠকাতো। তাদের নিরক্ষরতার সুযোগে মহাজন ও জমিদারেরা জাল সহি করা থেকেও বিরত ছিল না। প্রতিবাদ করলে তাদের মামলায় অভিযুক্ত করে সায়েস্থা করে সর্বশান্ত করা হত। এই অবর্ননীয় অবস্থা দেখে প্রতিবাদে এগিয়ে এলেন চার ভাই সিধু, কানু, চাঁদ ও ভৌরব। সাঁওতালদের অন্যায় অত্যাচার ও মহাজনদের কবল থেকে রক্ষা করা যায় তা নিয়ে তাদের মধ্যে চিন্তা ভাবনা চলতে থাকে। অনেক চিন্তা ভাবনার পর স্থির করলেন যে সাঁওতাল রাজ প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে তাদের অবস্থার মুক্তি হবে না। আর এই মুক্তি সংগ্রামে সশস্ত্র বিদ্রোহের প্রয়োজন। আর এ কর্মকান্ডে এলাকার মেহনতি জনগনকে সামিল করতে না পারলে আশানুরুপ ফল হবে না। তারা বিদ্রোহের ডাক সরাসরি না দিয়ে কৌশলের আশ্রয় নিলেন। তারা একদিন এলাকায় লোকজনদের জমায়েত করে ঘোষনা দিলেন তাদের চার ভাইকে ঠাকুর জিও স্বপ¦ আবির্ভূত হয়ে নির্দেশ দিয়েছেন অন্যায়কারী, অত্যাচারী, জোতদার, মহাজন, জমিদারদের উখ্যাত করে সাঁওতাল রাজ্য কায়েমের জন্য। সাঁওতাল আদিবাসী সহ মুক্তিকামী জনতার মধ্যে উক্ত ঘোষনা সঞ্চলিত হলো। সিধু ও কানু ঘোষনা করলেন ঠাকুরের আর্শিবাদ নিয়ে তারা অত্যাচারীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামবেন। ১৮৫৫ সালের গোড়ার দিকে তারা একটি পরোয়ানা প্রচার করলেন। সিধু-কানুর কাছে যখন সাঁওতালরা শুনল ঠাকুর জিও তাদের শোষনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে বলেছেন। তখন তরা আর বসে থাকতে পারলেন না। তারা মানসিক ভাবে প্রস্তুত হতে লাগলো বিদ্রোহের জন্য। আলোচনার জন্য ভগলা দিঘীর গ্রামে সাঁওতালেরা সমবেত হলে সির্দ্ধান্ত মত পরদিন এক সঙ্গে সবাই শিকারে বেরুবে। পরদিন সিধু-কানুর নেতৃত্বে ৪০/৫০ জন সাওতাল যুবক অস্ত্র-সস্ত্রে সজ্জিত হয়ে শিকারে যাওয়ার পথে দারোগা মহেশ দত্ত, ২ জন সিপাহী ও কয়েক মহাজনের সামনে পড়ে তারা। দারোগার সঙ্গে ২টি দড়ি বোঝাই গাড়িও ছিল। মূলত তারা সাঁওতালদের ঘোষনা ও সিদ্ধান্ত জানতে পেরেছে। দারোগার সঙ্গে তাদের পথি মধ্যে তাদের বাক-বিতিন্দার এক পর্যায়ে বিদ্রোহী সিধু-কানু সশস্ত্র দল ঘটনা স্থলে দারোগা মহেশ এবং কানু, মানিক রায় মহাজনকে উত্তেজিত ও সংগঠিত সাঁওতালরা হত্যা করে। এ ঘটনার পর ভাগোরপুর সহ বিভিন্ন এলাকায় বিদ্রোহের আগুন ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন জায়গায় সরকারী বেসরকারী লোকজন সহ অত্যাচারী জমিদার ও মহাজন অনেকে সাঁওতালদের হাতে নিহত হয়। ১৮৫৫ সালে ১৭ আগষ্ট সরকারের পক্ষ থেকে বিদ্রোহীদের আতœসমর্পনের অহবান জানানো হলো। বিদ্রোহীরা সরকারের আহবান ঘৃনা ভরে প্রত্যাখান করেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার সেনাবাহিনী মাঠে নামায় এবং পরিস্থিতী সামাল দিকে শত শত বিদ্রোহীকে হত্যা করা শুরু করে সেনাবাহিনী। এক দিকে কামান বন্ধুক অপর দিকে তীর ধনুকের লড়াই। কয়েক দিনের মধ্যেই সেনাবাহিনী ভগলা দিঘীর গ্রাম ধ্বংস করে দেয়। সিধু-কানুর বাড়ি সহ গ্রামের সব বাড়ী আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হলো। আশ্রয়হীন ও খাদ্যহীনতার কারণে অনেকে দুর্বল ও অনেকে ধরা পরে। বিদ্রোহীদের মনোবন আস্তে আস্তে দুর্বল হতে লাগল। কানু সঙ্গীদের নিয়ে হাজারীবাগ অভিমুখে পালাবার সময় জারয়ার সিং নামক ব্যক্তির তৎপরতায় ১৮৫৫ সালের ৩০ নভেম্বর ধরা পড়েন। শেষে কানুর বিরুদ্ধে রাজদ্রোহ, লুন্ঠুন, অত্যাচার ও হত্যার অভিযোগে ১৮৫৬ সালের ১৪,১৫ ও ১৬ জানুয়ারী স্পেশাল কমিশনার এলিয়টের এজলাসে তাদের বিচার হয়। বিচারে কানুকে মৃত্যেুদন্ডে দন্ডিত করা হয়। এই বিদ্রোহে ৩০ হাজার আদিবাসী প্রাণ হারায়। আজ ১৬৮ বছর বিদ্রোহের পার হলেও আদিবাসীরা অত্যাচার আর শোষন থেকে মুক্ত হয় নি। বিট্রিশ সরকার গেছে, জমিদার মহাজন গেছে, তবুও আজ স্বাধীন দেশে বাংলাদেশের মাটিতে বিট্রিশ সরকারের তুলনায় কম নির্যাতিত হচ্ছে না বলে আদিবাসীদের অভিযোগ উঠেছে। এখনও তাদের জমি-জায়গা জাল করা হয়। তাদের প্রতি মিথ্যা মামলা নির্যাতন নিত্য দিনের সাথী। আজ ৩০ শে জুন অন্যায়ের বিরুদ্ধে আদিবাসীদের প্রতিবাদের দিন। সিধু, কানু, চাঁদ ও ভৌরব শিখিয়ে গেছে, সত্য প্রতিষ্ঠায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে। তাই উপমহাদেশ সহ পৃথিবীর মুক্তিকামী মানুষ এই দিনটিকে যথাযোগ্য মর্যাদায় বিদ্রোহ দিবস হিসেবে প্রতি বছর পালন করে থাকে।

  • 40
    Shares